Last Update

Friday, October 9, 2015

ছিন্ন আঙুল by অদিতি ফাল্গুনী

ঢাকেশ্বরী গ্রামের তন্তুবায়ের ঘরের বালবিধবা মেয়ে সুরবতী বসাক এক সন্ধ্যায় নদীর তীরে জল আনতে গিয়ে মুখোমুখি ঘোড়ায় চেপে আসা এক গোরা অশ্বারোহীর হাতে অপহৃত হওয়ার দিন সাতেক পর গ্রামে ফিরে আসে। ফিরে এসে সেই সন্ধ্যায়ই গায়ে আগুন ঢেলে বাবা-মা-ভাই-বোনকে জাতিচ্যুত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার শেষ চেষ্টা করেছিল সুরবতী। তবে সে চেষ্টা বিশেষ ফলপ্রসূ হয়নি। আগুনে ভয়ানকভাবে পুড়ে কয়লা হয়ে গিয়েছিল বৈকি সেই অষ্টাদশী। তবু পঞ্চায়েতের শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতদের মনে হলো কি না, যে ঘরের নারী গোরা সৈন্যের হাতে অপহৃতা হয়, সে ঘরের সবাই মিলে ঘটি-বাটি বেচে পণ্ডিতদের নগদ অর্থ দিক বা দগ্ধ-ঘৃত পান করুক, সনাতন ধর্মে তাদের আর জায়গা হতে পারে না। কাজেই সুরবতী বসাকের জেদি, অভিমানী পিতা সুশান্ত কুমার বসাক শুভানুধ্যায়ী আত্মীয়দের দেওয়া গয়া-কাশী পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ অগ্রাহ্য করে সে রাতেই মুসলিম তন্তুবায় তথা জোলা পাড়ার নেয়ামত সর্দারকে খবর পাঠালেন যে পরদিন সকালেই তিনি সপরিবারে মুসলিম হতে চান। এহেন সংবাদে নেয়ামত সর্দার বিস্মিত হলেন। সুশান্ত বসাক নামী তন্তুবায়। তাঁর দুই বিধবা কন্যা আঠারোর সুরবতী আর দশের চম্পাবতীর দুর্দান্ত বয়নদক্ষতার গল্প জোলাপাড়ায় বাতাসে ভেসে আসে! বছর দুই আগে অষ্টম বর্ষীয়া চম্পাবতী এক সকালে পূজার ফুল তুলতে চলে এসেছিল জোলাপাড়ার সামনে নেয়ামত সর্দারের হাতে লাগানো একটি কামিনী ফুলগাছ অবধি। সরস্বতী প্রতিমার মতো শুভ্র,
ফুটফুটে বালিকার হাতের অত্যাশ্চর্য কোমল আঙুলে মসলিনের কাজ কেমন ফুটে উঠবে, সেটা ভেবে সর্দারের বহুদিনের বয়নকারী মন অস্থির হয়ে উঠেছিল! তবে এই বালিকা তো বসাকপাড়ার। জোলাপাড়ার অন্য মেয়েদের প্রতিবার দেশে-বিদেশে মসলিন পাঠানোর আগে নেয়ামত সর্দার হাতে ধরে যেমন শেখান, কাজ আদায় করে নেন, তেমনটি এই বালিকার প্রতি তাঁর তো শিক্ষকের কোনো অধিকার নেই! চম্পাবতীর নিজের বাবা খুব ভালো জামদানি বোনে। তবে জামদানি ছাড়া মসলিনের অন্যান্য জাত এই জোলাপাড়াতেই বোনা হয় বেশি। নেয়ামত সর্দারের নিজের একটি মেয়ে ছিল চম্পাবতীর বয়সী। দু-বছর হয় মা শীতলার দয়ায় মরেছে নূরজাহান। নূরজাহানের সঙ্গে মাঝেমধ্যে খেলতে দেখা যেত চম্পাবতীকে। নূরজাহানের মৃত্যুর দু-মাসের মাথায় আট বছরের চম্পাবতীর বিয়ে হয়েছিল এক দ্বাদশ বর্ষীয় বালকের সঙ্গে। বিয়ের ছয় মাস পর সর্পদংশনে মারা যায় দ্বাদশবর্ষীয় সেই বালক। হিন্দুর ঘরে ঘরে বালবিধবা। একবার বিয়ে হলে আর কি বিয়ে হতে পারে তাদের? এখন চম্পাবতী তার পিতার সিদ্ধান্তে মুসলিম হলে নেয়ামত সর্দারের লাভ যেটা হতে পারে যে এই বালিকার স্বর্ণাভ, কোমল আঙুলে তিনি একে একে তুলে দেবেন মসলিনের যাবতীয় বুননরহস্য। ছয় মাস লাগে যে একটুকরো মলমল খাস বানাতে—নবাব আর সম্রাটদের জন্য তেমন মসলিন বোনা শিখবে না চম্পাবতী?
নবাব-আমির-জমিদার-রাজাদের নাচমহলে তামাম রাত ধরে নাচে যে এলাহাবাদ থেকে আসা নামী বাঈজিরা, তাদের নাচের পোশাক বানানো হয় ঝুনা মসলিনে। রং বড় স্বচ্ছ জাতের মসলিন। দরিয়া মসলিনে থাকে ডোরা কাটা দাগ। রাজা-বাদশাহদের পাগড়ি বানাতে শিরবন্দ; তবে আলবাল্লি বলো কি তানজিব, খাসা কী নয়নসুখ— মসলিনপাড়ার সর্দার হিসেবে এই বুড়ো হতে চলা নেয়ামত জানেন সবচেয়ে কষ্টের কাজ, সবচেয়ে বেশি ধৈর্য আর মনের শান্তি লাগে আবে রঁওয়া আর শবনম বুনতে। আবে রঁওয়া যেন বর্ষাদিনে বয়ে চলা নদীর স্রোতের মতো। হুবহু সেই নদীর না সাদা না সবুজ না নীল বা এসবের মাঝামাঝি এক রং; আর নদী স্রোতের মিহি কোমলতা ফুটিয়ে তুলতে হয় আবে রঁওয়ায়। আর শবনম তো ভোরের ঘাসের স্বচ্ছ শিশির। ঢাকেশ্বরীর এই জোলাপাড়ার সব নারীকে এই শেষ দুই জাতের মসলিন বোনার অধিকার দেন না নিয়ামত সর্দার। এমনিতেই সবচেয়ে শান্ত, নম্র আর কোমলতম আঙুলের মেয়েদের মসলিন বোনার কাজ দেওয়া হয়। ঝগড়াটে, চপল কিংবা ঘর-সংসারের কাজে হাতে কড়া পড়া আঙুলের মেয়েদের দিয়ে মসলিন বোনা যায় না। সত্যি বলতে কুমারী, বিধবা কী নিঃসন্তান নারীর হাতে মসলিন খোলতাই হয় ভালো। পিতার সিদ্ধান্তে চম্পাবতী মুসলিম হলে একটাই সমস্যা—বিয়ে হয়ে যাবে না তো আবার? অবশ্য বামুন পণ্ডিতদের অত্যাচারে বছর দশেক আগে ওই যে বালবিধবা দামিনী আর তার বাবা-মা মুসলমান হয়েছে; কিন্তু দামিনীর দ্বিতীয় বিয়ে হয়নি। হয়নি বলেই হয়তো দামিনী বা আতরন্নেসার হাতের মসলিনের এত কদর। চম্পাবতী কি দ্বিতীয় দামিনী হয়ে উঠতে পারবে?
সামনে মসলিেনর চালানের সময়। কত জাতের ব্যাপারীরা আসবে—চন্দননগর, কাশিমবাজার থেকে নানা জাতের গোরারা। নবাব-বাদশাহ-জমিদারদের কত চাহিদা! এই ঢাকেশ্বরী মসলিন গ্রামের অল্পবয়সী নারীরা ভোর রাতে ঘুম থেকে উঠে সকাল অবধি মাকুতে শুরু করবে খটখট।
২. শিপমেন্টের আগে মাথার চুল অবধি খাড়া হওয়ার অবস্থা হয় ফ্যাক্টরির সবার। মালিক বা ম্যানেজার থেকে শুরু করে শ্রমিক—কারোর চোখেই ঘুম নেই। ‘আহ্...’—হাতে নিডল ফুটে কাতরায় পুষ্প। ‘দেখি? এত কাতরাইলে চলে? গার্মেন্টসে কাজ করলে হাতে একটু-আধটু এমন লাগবেই। প্যারামেডিক আপাকে ডাকলেই হাত ব্যান্ডেজ করে দেবে।’ ‘সামনে কি স্ট্রাইক আছে?’—রাহেলাকে জিজ্ঞাসা করে পুষ্প। ‘না। আগের দুই মাসের বেতন বাকি তয় এই মাসের বেতন তো মালিক দিচ্ছে। এখন সামনে শিপমেন্ট। এই সময় তো কাজ বাদ দেওয়া যায় না।’ ‘এমডি স্যার মনে কয় টেনশনে। জিসপি-জিসপি কইরা কয়দিন সবার মাথা খাইয়া ফেলতাছে। জিসপি কি তুমি জানো?’
‘কে জানে জিসপি কী?’
‘ছেলেরা তো অনেকেই কাম ছাইড়া ফ্যাক্টরি গেটের সামনে স্লোগান দিতাছে।’ ‘ব্যাডাগো কী—চাকরি না থাকলে রাস্তায় শোবে। মেয়েমানুষ কি তাই পারে? ওই বস্তির খুপরি ঘরটার ভাড়া দিতে চাকরি লাগবে না? মালিকে যা দেয় তাই সই।’ ফ্যাক্টরি গেটের সামনে থেকে স্লোগান ভেসে আসে, ‘শ্রমিকের রক্ত বৃথা যেতে দেব না...বৃথা যেতে পারে না...আমার ভাই মরল কেন?...জবাব দে...জবাব দে...’
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে একটি টেবিলের ওপর রাখা টিভির রিমোট কন্ট্রোল ঘুরিয়ে সিএনএন, বিবিসি, একাত্তর টিভি, সময়, ইনডিপেনডেন্ট, দেশটিভি, বাংলাভিশন, এটিএন নিউজ—তিন মিনিটে চ্যানেল সার্ফিং সেরে ফ্যাশন টেক্সটাইলের এমডি টেবিলের ওপর রাখা একটি গ্লাসের সেভেন-আপে চুমুক দেন। সামনে বসা অধস্তন কর্মকর্তারা।
‘বায়ারদের জন্য যে প্রেজেন্টেশন স্লাইডগুলো তৈরি করতে বলেছিলাম সেগুলো কি করা হয়েছে?’
‘জি স্যার, আপনি বললেই খসড়া স্লাইডগুলো দেখানো যায়।’ ‘তাহলে শুরু করেন।’ এ কথায় খুশি হলো ফ্যাশন টেক্সটাইলসের নবনিযুক্ত বায়ার্স লিয়াজোঁ কর্মকর্তা। খুটখুট করে ল্যাপটপে পেনড্রাইভ জুড়ে দিল তক্ষুনি। ‘বাংলাদেশ হ্যাজ দ্য প্রাউড লিগ্যাসি অব গর্জিয়াস টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি সিন্স দ্য মুঘল রেজিম। দ্য ক্লাইমেটিক হিউমিডিটি অব ঢাকা অ্যান্ড ইটস অ্যাডজয়নিং ডিস্ট্রিক্টস অ্যান্ড নিম্বল ফিংগার্স অব কাম অ্যান্ড কোয়ায়েট বেঙ্গলি উইমেন প্রুভড টু বি ফ্রুটফুল ফর দ্য রাইস অব ফেমাস মসলিন। মিরাক্যুলাসলি এনাফ, উইমেন লেবারারস রোল ইন টুডেস আরএমজি সেক্টর গ্রোথ ইন বাংলাদেশ ইজ অলসো ইনোরমাস...’
‘আরে ধুর, কী ইতিহাস-ভুগোল শুরু করলা এই স্লাইড প্রেজেন্টেশনে? গত ১০ বছরে আমরা কী পরিমাণ প্রোডাক্ট এক্সপোর্ট করেছি সেটা দিয়ে শুরু করো।’ ‘এটা করতে দিন স্যার। ইউরোপিয়ান বায়াররা আমেরিকান বায়ারদের থেকে কালচারড। তারা এসব বর্ণনা পছন্দ করবে!’ 
৩. ‘ময়মনসিংহ যাইবা সুশান্ত দা?’
ধর্ম ছেড়েছে বটে সুশান্ত বসাক। তবু নেয়ামত সর্দার তাকে তার পুরোনো নামেই ডাকে। ‘গেলে ভালোই হয়। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে এখন ফুটি তুলা ফোটার কথা। আমাদের ঢাকেশ্বরীর গ্রামগুলোয় তো বাইরাইত আর দেশি ছাড়া অন্য তুলা তেমন ভালো হয় না! ফুটি ছাড়া জাতের মসলিন হয়?’
সুশান্ত বসাক বা জুবায়ের হোসেন বলে। ‘নদীর পাড়ে মসলিনের তুলা ফোটা দেখার আনন্দই আলাদা। বুড়িগঙ্গার তীরে আমাদের এই ঢাকেশ্বরী, অন্যদিকে ধরো বংশী নদীর তীরে ধামরাই, তিতবাদি, জঙ্গলবাড়ি কী বাজিতপুর—নদীগুলোর তীরে তীরে মসলিনের তুলা ফোটা দেখা...স্বর্গ কী বেহেশতে িক এত সুখ মেলে?’
‘সে ঠিক কথা। আমারে দ্যাখো। আমার কপাল পোড়া বিধবা মেয়েটা বাপরে রক্ষার জন্য গায়ে আগুন দিল। আত্মহত্যা কইরাই কি বাপের ধর্ম রক্ষা হইলো? গয়া বা কাশী পালাইতে পারতাম। কিন্তু তুমিই বিচার করো...আমার ছয়পুরুষের বুননকর্ম ছাইড়া আমি কি গয়া-কাশী গিয়া ভিক্ষা করতাম? তন্তুবায় আমরা। জানি শুধু এই বৃত্তিই। মাকুর সাথে, নানা জাতের সুতার সাথেই আমাদের ঘর-সংসার!’ ‘আবার সেই পুরোনো কথার তোলপাড় দাদা? যা হওয়ার হইছে! চলো চলো, ময়মনসিংহ যাওয়ার খেয়া ছাইড়া দিব! আর কিছুদিন গেলে বাড়ির ছেলেদের হাতে সব কাজের দায়িত্ব দিয়া তুমি–আমি কাশী-বৃন্দাবন হইয়া দিল্লির খাজা মইনুদ্দিন চিশতি পর্যন্ত সব তীর্থ, সব খানকা দেইখা যেন মরতে পারি।’ ‘তোমার মতো ফুরফুরা মন আমার নাই। একটা ব্যাপার লক্ষ করছ? কোথায় কোন পলাশীতে নাকি কোন নবাব মরছে, কোম্পানির শাসন চালু হইছে আর মসলিনের য্যানো বাজার কমতাছে।’ ‘সেইটা আমি লক্ষ করতাছি দাদা! মনে আছে, আমরা ছোটবেলায় বাপ-দাদার সাথে যখন কাজ করা শুরু করছিলাম, কত দেশের আর কত জাতের ব্যাপারীরা নৌকা নিয়া, ঘোড়া আর হাতি নিয়া আসত। মসলিন দিয়া কুলাইতে পারতাম না—এখন বাজার যেন সত্যি কমতেছে! তবু একদম কম না। আরমানি সাহেবরা এখনো চাচ্ছে—’
‘আর? ফরাসি সাহেবরা আর আসে না, ডাচ্রা আসে না। কোম্পানির লোক কিছু আসে। নবাব-বাদশারা আগের মতো চায় না।’ ‘নবাব-বাদশারা কি আর আছে? তাঁরা নাকি বেবাক মাইর খাইছে।’ বাবা আর নেয়ামত কাকার নদীঘাটে যাওয়ার দৃশ্য দূর থেকে দেখে চম্পাবতী। ১০ বছর বয়সে দিদি সুরবতী এক সন্ধ্যায় গায়ে আগুন লাগিয়ে মরার পরদিন সকালে বাবা কেন মা, দাদা আর তাকে নিয়ে এই জোলাপাড়ায় চলে এল—তাদের সবার একটি নতুন নাম হলো কে জানে! আজ চম্পার বয়স আরও ১০ বছর কি পার হয়নি? শবনম মসলিনের নামে নেয়ামত কাকা তার নাম রেখেছিলেন শবনম। তবে তাকে পুরোনো চম্পাবতী নামেই বেশি ডাকে মানুষ। দামিনী বা আতরন্নেসা মাসির পর চম্পাবতীই এই মসলিন গ্রামের নামঅলা মেয়ে। সবাই বলে, তার হাতের আঙুল চম্পককলি। সেই আঙুলে মসলিনের কাজ যেমন ফোটে তেমন আর কিছুতেই না। একজীবনে হিন্দু থেকে মুসলমান হলো তারা সবাই। কিন্তু মুসলমান হলেই কী? চম্পাবতী সেই দামিনী মাসির মতোই বালবিধবা রয়ে গেছে। বাবা মুসলমান হয়েছে ঠিকই তবে ঘরের মেয়ের একবারের জায়গায় দুবার বিয়ে মানতে চায় না। যেমন চায়নি দামিনী মাসির বাবা বলরাম দাদু। বাবার কাছে জামদানি বোনা আগেই শিখেছিল। নেয়ামত কাকার কাছে শেখা হলো মসলিনের নানা কারুকাজ। ‘যত মাকুর সুইয়ে আঙুল ফুটবে আর রক্ত পড়বে তত মসলিন সুন্দর হয় রে মেয়ে! রক্ত ঝরায় শিখতে হয় আবে রঁওয়ার জল আর শবনমের শিশির কাপড়ের ওপর ফুটায় তোলা। এই মসলিনের যত বাহারি নকশা—সবই তন্তুবায় আর জোলাপাড়ার মেয়েমানুষের আঙুলের রক্ত।’—দামিনী মাসি বা আতরন্নেসা খালা বলেছিলেন গত শীতে ম্যালেরিয়া জ্বরে ভুগে মৃত্যুর আগে।
৪. বাবা আর নেয়ামত কাকা দুজনেই মারা গেছে বহুদিন। এরপর ভাইয়েরা মরে গিয়ে ভাইয়ের ছেলেদের ঘর-গেরস্থি করার সময় চলে এল। চম্পাবতী বসাক বা শবনম বেগম সেই বালিকা বয়স থেকে মাকু চালাতে চালাতে কখন যে বালিকা থেকে বুড়ি হয়ে গেল তা তার নিজেরই ঠাহর হয় না। মাঝেমধ্যে সময়ের নিকেশ থাকে না তার। এই না সেদিন পূজার জন্য সাদা কামিনী ফুল তুলতে নূরজাহানদের বাড়ি অবধি চলে গেল সে? আর নূরজাহান সইয়ের বাবা বলল, ‘মাশাআল্লাহ্! এ কেমন আঙুল তোমার মাইয়া?’ প্রতি বসন্তে মা শীতলার দয়া হয়, নূরজাহানের ওপরও দয়া হলো সেই ঘোড়ায় চড়া দেবীর। একটি বালক প্রায়ই চম্পাবতীর হাত ধরে টানে। বালকের সঙ্গে কুল-বরইয়ের বখেরা নিয়ে তার মারামারি হয়। মারামারি শেষে মা কান মলে বলে, ‘স্বামীর সাথে কুল-বরই নিয়ে ঝগড়া করিস বেহায়া মেয়ে? মরণ হয় না তর?’ বালক তার বধূর উদ্দেশে শাশুড়িমাতার বকুনি শুনে খিলখিল করে হাসে।
চতুরে কালো মেঘ উড়িতে লাগিল,
থাম থাম কালো মেঘ—
দুয়ারে আসিলো এক প্রস্থ বিদ্যাবাণ
এক সিদ্ধ গুনিন এসে সাপের বিষে নীল বালক স্বামীকে লক্ষ করে কত মন্ত্রই না পড়ল! দিন শেষে চিতা জ্বলল। মায়ের বিলাপ, ‘আমার দুইটা মাইয়াই বালবিধবা হলো রে ঠাকুর!’ দিদি—দিদি নিজের গায়েই আগুন দিল। তারপর জাত হারানো, নতুন জাতে আসা। তবু তো মসলিন বুনতে বুনতে দিন কাটছিল। এখন আর হাতি-ঘোড়া-নৌকায় চড়ে ব্যাপারীরা আসে না, কারও হাতে কাজ নাই—এ কেমন দিন?
‘সর্বনাশ হইছে, সর্বনাশ হইছে!’
বড় ভ্রাতুষ্পুত্র সামনে এসে হাউমাউ করে বিলাপ জুড়ে দেয়।
কানে কম শুনতে পায় সে আজকাল।
‘কী হইছে?’
‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গোরা সৈন্যরা আসতেছে। বাইছা বাইছা মসলিন বোনায় যাদের সুনাম, তাদের সবার আঙুল নাকি কাটবে। চলো পালাই!’
‘কোথায় পালামু? আমার সারা শরীরে বাত ব্যথা। পোলাপাইন ঠাট্টা কইরা কয় আমি চান্দের বুড়ি চরকা কাটি।’
খিক্ করে ফোকলা মুখে হাসে বুড়ি।
‘দেরি করে না। চলো পালাই!’
‘আঙুল কাটবে? কাটুক! মসলিন তো শ্যাষ। কাটুক!’
‘তোমার মাথা আউলাইছে!’
তিন-চারজন দীর্ঘকায় গোরা সৈন্য এবার সত্যিই ঢুকে পড়ল ভিটেয়। এ গ্রামের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা নাকি আর মসলিন বুনতে পারে না। তবে হাতে গোনা কিছু বুড়োবুড়ি আছে যারা এখনো বুনতে জানে। তাদেরই ভয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। ম্যাঞ্চেস্টারের কাপড়কে ব্যবসা করতে হলে মসলিনের ওই জাদুকরি জ্ঞান আজও যাদের আছে, তাদের বৃদ্ধাঙ্গুল আর তর্জনী কাটতে হবে—এটাই কোম্পানির নির্দেশ।
‘শি ইজ দ্য এনশিয়েন্ট লেডি, স্টিভ? শি নোজ দ্য নো–হাউ অব মসলিন?’
থমাস আর্নল্ড তাকাল স্টিভ রবসনের দিকে।
‘তোমরা কেডা?’
একরাশ পুরোনো তুলো নিয়ে অভ্যাসমতো চরকার সামনে বসে থাকা চম্পাবতী তার ঘোলাটে চোখে গোরাদের দিকে তাকায়।
‘আঙুল কাটবা? কাটো!’
চম্পাবতীর মাথার সাদা চুল বাতাসে হু হু উড়তে থাকে। আজও তার আঙুলগুলো শীর্ণ, কোমল আর স্বর্ণাভ। আঙুলগুলো সে বাড়িয়ে দেয় গোরা সৈন্যদের দিকে। এই ঘটনার বহু বছর পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক অতি অখ্যাত সৈনিক স্টিভ রবসন মৃত্যুর আগে পাদরির কাছে পাপ স্বীকারের সময় স্বীকারোক্তি করে যান যে সৈন্য হিসেবে ভিনদেশে দায়িত্ব পালনের সময়ে তিনি কোনো ভিনদেশি যুবতীর ধর্ম হরণ করেননি, সম্মুখসমর ছাড়া কারও প্রাণ নেননি। এসব দিক থেকে তাঁর বিবেক মুক্ত। তবে দায়িত্ব পালনের প্রতিজ্ঞায় ঢাকেশ্বরীর একাধিক জনপদে কিছু বৃদ্ধ-বৃদ্ধা তন্তুবায়ের হাতের আঙুল তাঁকে কাটতে হয়েছিল। সেই সব কর্তিত, রক্তাক্ত আঙুলের দৃশ্য গত দুই দশক ধরে তাঁকে অ্যালকোহলিক করে রেখেছে।
৫. ঈদের বোনাসের অর্ধেক আজ মিলেছে। ফ্যাক্টরি থেকে বের হয়ে পুষ্প তড়িঘড়ি পা চালায়। এখান থেকে আর এক মাইল পায়ে চললেই পরি বুবুর পিঠা ভাজার দোকান। পরি বুবুই তাকে ঢাকায় এনে কাজ জুটিয়ে দিয়েছিল গার্মেন্টসে। প্রথমে এক কারখানাতেই কাজ করত দুজন। প্রথম বাচ্চা হওয়ার সময় কাজ চলে গেল পরির। বাচ্চা হওয়ার ছয় মাস পর দ্বিতীয় যে ফ্যাক্টরিতে পরি বুবু কাজ নিল, সেখানেই একদিন যেন নেমে এসেছিল কেয়ামতের দিন! একদিক থেকে পরির ভাগ্য ভালোই বলতে হবে। তার হাত যায়নি, পা যায়নি, শুধু বাঁ-হাতের পুরো তালু আর ডান হাতের বুড়ো আঙুল ও পাশের আঙুলটি গেছে। তাকে উদ্ধার করতে সেটুকু কাটতেই হয়েছিল। তাই তো ফ্যাক্টরিতে তার আর কাজ আর মেলে না। তবু এই এক বছরে এক হাতের তিনটি মাত্র আঙুল দিয়ে পরি বুবু দিব্যি রাস্তার পাশে কেরোসিন স্টোভ ধরিয়ে পিঠা ভাজা শিখে গেছে। ঝিমঝিম করে বৃষ্টি নামে। কেন জানি না সহসা ত্রস্ত হয়ে পুষ্প তার ডান হাতের আঙুলগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে দেখে।

Post a Comment

 
Back To Top