Last Update

Tuesday, October 4, 2016

বর্ষায় বিপন্ন হাওরের শিক্ষা

৮ জুন তারিখটি ক্যালেন্ডারের পাতায় একটি স্বাভাবিক তারিখ হলেও সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার জন্য একটি অস্বাভাবিক ও বেদনাময় দিন ছিল। ২০১০ সালের ওই দিনে উপজেলার সেলবরষ ও পাইকুরাটি ইউনিয়নের শৈলচাপড়া হাওরের মধ্যবর্তী স্থানে ঝড়ো বাতাসের কবলে পড়ে ট্রলারডুবিতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে বাদশাগঞ্জ পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩ জন, বাদশাগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫ জন শিক্ষার্থী এবং পাইকুরাটি ইউনিয়নের বালিজুড়ি গ্রামের ৩ মহিলা ও ৫ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছিল। নিহত শিক্ষার্থীদের বাড়িও বালিজুড়ি গ্রামে। ঘটনার দিন ট্রলারে থাকা যেসব যাত্রী প্রাণে বেঁচেছিলেন, সেই ঘটনা মনে হলে আজও তাদের গা ভয়ে শিউরে ওঠে। এখনও বালিজুড়ি থেকে ওই দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জনের জন্য শুকনো মৌসুমে হেঁটে আর বর্ষায় হাওর পাড়ি দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। এত বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটার পরও এখন পর্যন্ত বর্ষাকালে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্বিঘ্নে যাতায়াতের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা চালু করা হয়নি। যখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তখন আমরা শুধু আপসোস করি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এ ধরনের দুর্ঘটনা যেন আর না ঘটে সে ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করি না।
২০১৪ সালের ১৫ এপ্রিল দুপুরে উপজেলার বৌলাই (সুরমা) নদীতে গোলকপুর খেয়া ঘাটে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটলেও স্থানীয় লোকজন গোলকপুর হাজী আবদুল হাফেজ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩০ শিক্ষার্থীর প্রাণ বাঁচিয়েছিল। এসব শিক্ষার্থীর মতো ওই অঞ্চলের শত শত শিক্ষার্থী প্রতিদিন নদী পাড়ি দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। শুধু বালিজুড়ি বা গোলকপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার শিক্ষার্থীরা নয়, বরং উপজেলার হাওর পাড়ের সব শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। কখনও কখনও শিক্ষার্থীরা এলাকার অন্য শিক্ষার্থীদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে একটি বড় নৌকা ভাড়া করে বর্ষাকালে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করে। তবে সব শিক্ষার্থীই যে এ সুবিধা ভোগ করতে পারে তা নয়। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা অর্থাভাবে এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। হাওর পাড়ের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। বোরো ফসল ঘরে তোলার পর হাওরাঞ্চলের মানুষজন বিভিন্ন হাওরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। এ সময় অনেক শিক্ষার্থীই পরিবারের লোকজনের সঙ্গে হাওরে মাছ ধরার কাজে ব্যস্ত থাকায় বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে। বর্ষাকালে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
কোনো কোনো শিক্ষক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের ম্যানেজ করে স্থানীয় ৮ম/৯ম শ্রেণী পাস করা যে কোনো একজন ছেলে বা মেয়েকে টাকার বিনিময়ে পাঠদানের জন্য নিয়োগ দেন। এ ক্ষেত্রে মাসের পর মাস ওই ফাঁকিবাজ শিক্ষক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি অজানাই থেকে যায়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দফতরের নিয়মিত বিদ্যালয় পরিদর্শন করা উচিত হলেও তারা লোকবল সংকটের অজুহাত দেখান। হাওরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থায় বর্ষাকাল যতটা না বিরূপ প্রভাব ফেলে তার চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে হাওর পাড়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের বৈরী মনোভাব। তারা চাকরি করতে রাজি; কিন্তু কষ্ট স্বীকার করতে রাজি নন। তাই অনেকেই বিদ্যালয়ে না যাওয়ার বাহানা খোঁজেন। তবে ওইসব শিক্ষককে দোষ দিয়ে লাভ কী? হাওরাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরি করতে গেলে বিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী কোনো বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়, যেখানে একজন শিক্ষককে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে নাগরিক সুযোগ-সুবিধাবিহীন কে জীবন কাটাতে চায়?
বিদ্যালয় বা বিদ্যালয়ের আশপাশে বসবাসের সুব্যবস্থা না থাকায় অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীর মতোই নিজ বাড়ি বা দূর-দূরান্ত থেকে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করেন। এতে করে ওই শিক্ষকদের জীবনও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। হাওরের বিশাল ঢেউ কখন কার প্রাণ কেড়ে নেয় বলা মুশকিল। পেটের তাগিদে হাওরের বিশাল বুক চিরে একজন শিক্ষক যখন হাওর পাড়ের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে রওয়ানা দেন, তখন হয়তো মনে মনে দোয়া পড়েন যেন সহিসালামতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন। ফিরে এসে আবার পরিবার পরিজনের সঙ্গে আনন্দ-বেদনা উপভোগ করতে পারেন। বহু বছর ধরে শুনে আসছি হাওরাঞ্চলের শিক্ষকদের জন্য হাওর ভাতা চালু করা হবে; কিন্তু সেটি আলোর মুখ দেখছে না। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। হাওরাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকদের জন্য বসবাস উপযোগী আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দফতরকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। নজরদারি জোরদার করতে হবে।
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিদের (যাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) সততার পরিচয় দিতে হবে। আর যেন একটি বিদ্যালয়েও কোনো প্যারা শিক্ষক নামে কোনো শিক্ষক নিয়োগ না দেয়া হয়। শিক্ষকরা হাওরাঞ্চলে কাজ করতে গিয়ে কখনও কখনও ভিলেজ পলিটিক্সের শিকার হন। এই ভিলেজ পলিটিক্সের অদৃশ্য শক্তির কবল থেকেও শিক্ষকদের সুরক্ষা দিতে হবে। হাওরাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যাতায়াতের জন্য হাওর উপযোগী উপযুক্ত টেকসই যানবাহন চালুর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বর্ষাকালে ঝড়ো বাতাস বা বৈরী আবহাওয়ায় স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সভা-সেমিনারের আয়োজন করা যেতে পারে। আমরা হাওরাঞ্চলে বিদ্যালয়গামী আর কোনো নৌযানের দুর্ঘটনার খবর শুনতে চাই না। এ অঞ্চলে ‘বালিজুড়ি ট্র্যাজেডি’র মতো কোনো বেদনাদায়ক ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটুক। হাওরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থায় বর্ষাকাল কোনো অন্তরায় না হয়ে শুভ ফল বয়ে আনুক।
এনামুল হক এনি : সাংবাদিক
enamulhaque.dps@gmail.com

Post a Comment

 
Back To Top