Last Update

Saturday, November 5, 2016

মন্দিরে হামলা কি ধর্ম অবমাননা নয়?

নাসিরনগরে হিন্দুদের বাড়িঘরে
হামলার চার দিন পর অগ্নিসংযোগ
বৃহস্পতিবার রাতে নাসিরনগরে ফের হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। স্থানীয় লোকজন, প্রশাসন ও পুলিশ বলছে, উপজেলা সদরের মধ্যপাড়ার অমর দেবের রান্নাঘর, দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা ফুলকিশোরের গোয়ালঘর, একই এলাকার মৃণাল কান্তির রান্নাঘর ও জ্বালানি কাঠ রাখার ঘরসহ কয়েকটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এর আগে রোববার ১৫টি মন্দির ও ৬০-৭০টি হিন্দু বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট হয়। অথচ মন্ত্রী বলেছিলেন, ‘সব স্বাভাবিক।’ এরপর যশোরেও হিন্দুদের বাড়িঘরে এবং হবিগঞ্জের মাধবকুণ্ডে মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার চার দিন পর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর আসনের সাংসদ ছায়েদুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে যেসব কথা বলেছেন, তাতে আক্রান্ত মানুষগুলো আশ্বস্ত হননি। বরং বেদনাহত ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। গতকাল বেলা ১১টায় যখন জাতীয় প্রেসক্লাবে যাই, তখন দেখি তোপখানা রোডে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদসহ সংখ্যালঘু বিভিন্ন সংগঠনের বিক্ষোভ মিছিল চলছে। ২০০১ সাল থেকে সংখ্যালঘুদের ওপর অনেক হামলা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু বিক্ষোভে ফেটে পড়া এ রকম মিছিল দেখিনি। মিছিলকারীরা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রীর পদত্যাগ চাইছেন এবং তাঁর নাম ধরে স্লোগান দিচ্ছিলেন। নাসিরনগর ডাকবাংলোতে গিয়ে ওই মন্ত্রী বলেছিলেন, ‘নাসিরনগরের পরিবেশ সাংবাদিকেরাই অস্বাভাবিক করে তুলেছেন। নাসিরনগরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক, আপনারা অস্বাভাবিক করে তুলেছেন। আমি সার্বক্ষণিক এলাকার সব খোঁজখবর রাখছি।’ (সমকাল, ৩ নভেম্বর ২০১৬)। তিনি স্থানীয় হিন্দু নেতাদের অশালীন ভাষায় গালাগাল করেছেন বলেও জানান নাসিরনগর থেকে ফিরে আসা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের এক নেতা। তাঁর কথা শুনে অবাক হলাম। যেখানে হিন্দুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে আক্রমণ করা হয়েছে, সেখানে স্থানীয় সাংসদ ও মন্ত্রী কী করে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সান্ত্বনা না দিয়ে সেই সম্প্রদায়ের নেতাদের গালাগাল করেন? তা–ও ‘সংখ্যালঘু বিদ্বেষী’ বিএনপি বা জামায়াতের কোনো মন্ত্রী নন, সংখ্যালঘুদের ত্রাণকর্তা বলে দাবিদার আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী। এখানেই শেষ নয়। নাসিরনগর ঘুরে আসা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওই নেতা আমাকে আরও বলেছেন, ‘মন্ত্রী মহোদয় বদলি হয়ে যাওয়া ওসিকে স্থানীয় পাঁচজন সংখ্যালঘু নেতাকে গ্রেপ্তার করতেও বলেছিলেন।
কিন্তু ওসি বলেছেন, “আমি তো বদলি হয়ে গিয়েছি।”’ প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটিত হওয়া প্রয়োজন। সত্যি সত্যি মন্ত্রী এ রকম কথা বলেছিলেন কি না। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে আমরা যা জেনেছি, তা হলো ২৮ অক্টোবর জনৈক রসরাজ দাসের ফেসবুকে একটি অবমাননাকর পোস্ট দেওয়া হলে স্থানীয় মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠিয়ে দেয়। এরপর ২৪ ঘণ্টা ধরে মাইকিং করে রোববার কলেজ মোড়ে ও আশুতোষ মাঠে দুটি সমাবেশের আয়োজন করা হয়। কলেজ মোড়ের সমাবেশ শান্তিপূর্ণ হলেও মাঠের সমাবেশ থেকে উসকানিমূলক কথা বলা হয়, যার আয়োজক ছিলেন নাসিরনগর উপজেলা কমপ্লেক্স জামে মসজিদের ইমাম এবং উপজেলা কওমি ওলামা পরিষদের সহসভাপতি মোখলেছুর রহমান। স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাংশের অভিযোগ, শনিবার রসরাজ দাসকে গ্রেপ্তারের পরও নাসিরনগরের ইউএনও পরদিন রোববার দুটি সমাবেশ করার অনুমতি দেন, যা পরিস্থিতি খারাপ করেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আওয়ামী লীগ দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে জেলা নেতৃত্ব, আরেক দিকে মন্ত্রী ছায়েদুল হক। এক বিতর্কিত ব্যক্তিকে ইউপি নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ায় জেলা নেতৃত্ব মন্ত্রীকে দল থেকে বহিষ্কার করে, যদিও তা কেন্দ্র অনুমোদন করেনি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ রকম ঘটনা বিরল। নাসিরনগরের সহিংসতার পেছনে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল যে দায়ী, সেটি মন্ত্রীও গোপন রাখেননি। বৃহস্পতিবারের সমাবেশে তিনি আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার নাম উল্লেখ করে বলেছেন, ওরাই তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। আওয়ামী লীগের কে কার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন, সেটি জনগণের দেখার বিষয় নয়। কিন্তু সেই ষড়যন্ত্রকে কেন্দ্র করে কেন হিন্দুদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হবে,
কেন মন্দিরে হামলা হবে? দায় এড়াতে পারেন না ওসি ও ইউএনও। তাঁরা বিশৃঙ্খলার আশঙ্কাকে আমলে না নিয়ে দুই পক্ষকে সমাবেশের অনুমতি দিয়েছেন এবং একটি সমাবেশে গিয়ে বক্তৃতাও দিয়েছেন। ওসি বা ইউএনওর কাজ সমাবেশে বক্তৃতা করা নয়; বিশৃঙ্খলা বন্ধ করা। ওসি বদলি হলেও ইউএনও বহাল তবিয়তে আছেন! ২০১২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর একই অজুহাত তুলে কক্সবাজারের রামুসহ কয়েকটি এলাকায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে আক্রমণ চালিয়ে কয়েক শ স্থাপনা ভাঙচুর করা হয়। সরকার সেসব বাড়িঘর ও বৌদ্ধবিহার নির্মাণ করে দিলেও আক্রমণকারী কাউকে শাস্তি দিতে পারেনি। সেবার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বৌদ্ধ সম্প্রদায়, এবার হিন্দু সম্প্রদায়। ফেসবুকের পোস্ট অছিলা মাত্র। ব্যক্তিগতভাবে কেউ অপরাধ করলে গোটা সম্প্রদায় সে জন্য দায়ী হতে পারে না। রামুর ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে উত্তম কুমার নিজে ওই কাজ করেননি, তাঁর ফেসবুক ব্যবহার করে অন্য কেউ করেছেন। রসরাজও বলেছেন, তিনি ধর্ম অবমাননাকর কোনো পোস্ট দেননি। তাঁকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও হিন্দুদের বাড়িঘর ভাঙচুর, লুট এবং মন্দিরের প্রতিমা ভাঙার কী কারণ থাকতে পারে? মন্দিরে হামলা কি ধর্ম অবমাননা নয়?
প্রথম আলোর খবরে বলা হয়, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে মন্দিরে হামলা এবং হিন্দুদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে বড় অংশই কিশোর-তরুণ। শার্ট-প্যান্ট পরা এসব যুবক উপজেলার গোকর্ণ, পূর্বভাগ, চাপড়তলা, ভলাকুট, চাতলপাড়, গোয়ালনগর, বুড়িশ্বর, দাঁতমণ্ডল, ফান্দাউক, হরিপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে সমাবেশে যোগ দিতে এসেছিল। এদের একটি অংশ সমাবেশে যোগ না দিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাটে অংশ নেয়। আরেকটি অংশ সমাবেশ থেকেও হামলায় অংশ নেয়। তাহলে স্থানীয় প্রশাসন ও থানা-পুলিশ কী করেছে? তাদের কাজ কি বসে বসে তামাশা দেখা?
স্থানীয় হিন্দুদের অভিযোগ, চাপড়তলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সুরুজ আলীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একটি অংশ মিছিল নিয়ে সেদিন আশুতোষ মাঠের সমাবেশে যোগ দেয়। সেখানে সুরুজ আলী উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাংশ বলছে, বাইরে থেকে লোক পাঠানোর পেছনে সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুল হান্নানের ভূমিকা ছিল। জাতীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিপরীত মেরুতে থাকলেও হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা করার ব্যাপারে এক। রামুতেও একই ঘটনা ঘটেছিল। নাসিরনগরের ঘটনা তদন্তে আসা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য এনামুল হক চৌধুরী ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির পরিদর্শন করে বলেছেন, ‘একাত্তরে যেভাবে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে, নাসিরনগরের ঘটনার সঙ্গে এর মিল রয়েছে। এখানে পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। কেন, কী কারণে এখানে সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হলো?’ প্রকৃত ঘটনা বের করতে হলে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের বিকল্প নেই। কিন্তু বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠিত হলে কিংবা তারা যথাযথ রিপোর্ট দিলেই যে অপরাধীরা শাস্তি পাবে,
তার নিশ্চয়তা নেই। ২০০১–এর নির্বাচনের পর সারা দেশে বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডাররা যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন ও নৃশংসতা চালিয়েছিল, সেটিকে অনেকটা পুঁজি করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। সত্য উদ্ঘাটনের জন্য আওয়ামী লীগ সরকার একটি কমিশনও গঠন করেছিল, যার রিপোর্ট কয়েক বছর আগেই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে মামলা কিংবা শাস্তি হওয়ার খবর পাওয়া যায় না। শাস্তি পায়নি রামু বা সাঁথিয়ায় ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার দোহাই দিয়ে যারা সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আক্রমণ চালিয়েছিল, তারাও। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছেন, আক্রমণকারীরা বহিরাগত। স্থানীয় কেউ হামলা করেনি। এ তথ্য যদি সঠিকও ধরে নিই, স্থানীয় সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের লোকেরা কী করেছেন? তাঁরা কেন নিরাপত্তা দিতে পারলেন না? কেউ কেউ দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও তা কাজে আসেনি। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান সরকারের ইন্ধনে ঢাকায় দাঙ্গা লাগানো হয়েছিল এবং সেই দাঙ্গা রুখতে আমির হোসেন চৌধুরী নামের একজন মুসলমান দাঙ্গাকারীদের রুখতে গিয়ে তাদের হাতে জীবন দিয়েছিলেন। কিন্তু, আরও বেশিসংখ্যক মানুষ কেন প্রতিরোধে এগিয়ে আসবেন না?
২০০১-এর নির্বাচনের পর ঢাকার অদূরে শ্রীপুরে আক্রান্তকবলিত এক গ্রামে গেলে সংখ্যালঘু পরিবারের নারীরা বলেছিলেন, ‘বাবা, ভোটার তালিকা থেকে আমাদের নামটি বাদ দাও। তাহলে ভোটের কারণে কেউ আমাদের ঘরবাড়িতে হামলা চালাবে না।’ বাংলাদেশকে শান্তি ও সম্প্রীতির দেশ বলে আমরা বড়াই করি। কিন্তু সেই শান্তি ও সম্প্রীতি যারা ভঙ্গ করে, যারা ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করে, যারা ভিন্ন ধর্মের মানুষের ঘরবাড়ি লুট করে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রতিবাদ দেখি না। আমাদের প্রশাসন খুবই দায়িত্বশীল। রাজনীতিকেরা পরমতসহিষ্ণুতার জ্বলন্ত প্রতীক। আমাদের নাগরিক সমাজ মানবাধিকারের বলিষ্ঠ খেদমতগার। এসবের পরও সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন-হামলার ঘটনা ঘটে চলেছে। তাহলে গলদটি কোথায়?
ঐক্য পরিষদের এক নেতা অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে বললেন, এই যে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার নাম করে হিন্দুদের বাড়িঘরে আক্রমণ করা হলো, মন্দিরে হামলা হলো, সেটি ধর্ম অবমাননা নয়? কিন্তু অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে নিয়ত আঘাত করা হচ্ছে। কই, তারা তো কখনো কারও ওপর হামলা চালায় না। এমন কোনো মাস নেই যে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা হয় না। প্রতিমা ভাঙচুর হয় না। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুদের ওপর সারা দেশে সংঘটিত তাণ্ডবের পর লেখক-গবেষক মোহাম্মদ রফি লিখেছিলেন, ‘ক্যান উই গেট অ্যালং?’ আমরা কি এভাবে চলতে পারব? একই দেশে শত শত বছর পাশাপাশি থেকেও কেন একটি সম্প্রদায় আরেকটি সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে আক্রমণ করে? এর পেছনে আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মনস্তাত্ত্বিক কারণটাই বা কী?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

Post a Comment

 
Back To Top