Last Update

Tuesday, November 15, 2016

সাঁওতালরা ত্রাণ ফিরিয়ে দিলেন

সাঁওতালদের ওপর হামলায় আহত বিমল কিছকু রংপুর
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎ​সাধীন। গতকাল
বেলা ৩.৫৩ মিনিটে তাঁকে হাতকড়া পরা অবস্থায়
দেখা যায়। রাতে হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়। প্রথম আলো
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে নির্যাতনের শিকার সাঁওতালরা সরকারি ত্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছেন। ‘বাপ-দাদা’র জমি ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা ত্রাণ নেবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে শিল্পসচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, কাউকে চিনিকলের জায়গা দখল করে থাকতে দেওয়া হবে না। তবে সরকার সাঁওতালদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে। গতকাল সোমবার সকালে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল হান্নান গাইবান্ধার এই উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের মাদারপুর ও জয়পুর গ্রামে যান। দেড় শ পরিবারের প্রত্যেককে ২০ কেজি চাল, এক লিটার তেল, এক কেজি ডাল, এক কেজি আলু, এক কেজি লবণ ও দুটি করে কম্বল বিতরণের কথা ছিল। ইউএনও মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ঘরে ঘরে গিয়ে ত্রাণ নেওয়ার অনুরোধ জানালেও কেউ ত্রাণ নিতে রাজি হননি। সকাল থেকে মাদারপুর গির্জার সামনে ত্রাণ নিয়ে অপেক্ষা করে সন্ধ্যায় তিনি উপজেলা শহরে ফিরে আসেন। সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ইক্ষু খামার ভূমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সহসভাপতি ফিলিমিন বাস্কে মুঠোফোনে বলেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা প্রশাসনের কোনো ত্রাণ নেবেন না। তাঁরা বাপ-দাদার জমি ফেরত চান। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। ফিলিমিন বলেন, সাঁওতালদের নিহত হওয়া, বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের ঘটনায় কোনো মামলা বা তদন্ত কমিটি পর্যন্ত হয়নি। উল্টো মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁদের হয়রানি করা হচ্ছে।
৬ নভেম্বর গোবিন্দগঞ্জের রংপুর চিনিকলের জমিতে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। তাঁদের মধ্যে তিরবিদ্ধ হয়েছেন নয়জন এবং গুলিবিদ্ধ হন চারজন। এ সংঘর্ষের ঘটনায় তিনজন সাঁওতাল নিহত হন। এ ঘটনায় শুধু পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় গোবিন্দগঞ্জ থানায় ওই রাতে ৪২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৩০০ থেকে ৪০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি দেখিয়ে মামলা করা হয়। গতকাল বিকেল পর্যন্ত চারজন সাঁওতালকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ঘটনার নয় দিনেও এখানকার সাঁওতাল-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে আতঙ্ক বিরাজ করছে। মাদারপুর গ্রামের জোবা টুডু (৫৫) বলেন, তাঁর এক ছেলে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়ে। ভয়ে কলেজে যেতে পারছে না। মেরি টুডুর নতুন বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পুরোনো বাড়িতে লুটপাট হয়েছে। তাঁদের ঘরে খাবার নেই। প্রশাসন নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেও সাঁওতালরা স্বস্তি পাচ্ছেন না। গত রোববার গাইবান্ধার ওই অঞ্চল থেকে ঘুরে এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারকাত। গতকাল রাতে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি তাদের জিজ্ঞেস করেছি আপনারা কী চান? তারা বলেছে জমি চাই। জিজ্ঞেস করেছি জীবন বড়, না জমি বড়? তারা বলেছে, বাপ-দাদার জমি তাঁরা ফেরত চান।’ ঢাকায় নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, শিল্পসচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া গতকাল মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেছেন, ৬ নভেম্বর চিনিকলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গিয়েছিলেন পাশের একখণ্ড জমিতে আখের বীজ কাটতে, উচ্ছেদ অভিযানে নয়।
কিন্তু অবৈধ দখলদারেরা তাতে বাধা দেন। তির-ধনুক নিয়ে তাঁরা আক্রমণ করেন। কিছু স্বার্থান্বেষী ভূমিদস্যু এ ঘটনায় ইন্ধন দেয়। নিরীহ ও সহজ-সরল প্রকৃতির সাঁওতালরা পরিস্থিতির শিকার। তাঁদের প্রতি সরকার অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। সেখানে হতাহত ব্যক্তিদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। প্রয়োজনে ভূমিহীন সাঁওতালদের পুনর্বাসনেরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু সরকারি মালিকানাধীন চিনিকলের জায়গা দখল করে কাউকে থাকতে দেওয়া হবে না। পুলিশের গুলিতে সাঁওতালরা নিহত হয়েছেন কি না, সে নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর কারণ জানা যাবে বলে উল্লেখ করে মোশাররফ হোসেন দাবি করেন, পুলিশ ওই দিন কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়েছিল। এতে কারও প্রাণহানি হওয়ার কথা নয়। শিল্পসচিব আরও বলেন, ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে। ইন্ধনদাতাদের সম্পর্কে সংবাদকর্মীদের নিশ্চিত করতে তিনি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের অংশবিশেষ উদ্ধৃত করেন। মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, রংপুর চিনিকলের জন্য সরকার ১৯৫৪ সালের দিকে ১ হাজার ৮৪২ একর জমি অধিগ্রহণ করে। তখনই এসব জমির মালিকদের আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।
২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সরকারের সিদ্ধান্তে চিনিকলটি যখন সম্পূর্ণ বন্ধ (লে-অফ) ছিল, তখনো কেউ সেখানে জমির দাবি নিয়ে আসেনি। হঠাৎ গত ১ জুলাই ‘ভূমি উদ্ধার কমিটি’ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে সাঁওতালরাসহ এলাকার ও এলাকার বাইরের কিছু লোক এসে চিনিকলের জমিতে অস্থায়ী ঘর নির্মাণ শুরু করে। তারপর থেকে এ ধরনের ঘরের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে প্রায় ২৫০টিতে পৌঁছায়। বিষয়টি নিয়ে চিনিকলের কর্মকর্তারা ও স্থানীয় প্রশাসন তাদের সঙ্গে কথা বলে। পরে একটি সমঝোতা সভারও আয়োজন করা হয়। কিন্তু তারা চিনিকলের জমির দখল ছাড়তে রাজি হয়নি। বরং ১২ ও ১৬ জুলাই স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই তারা উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে। সংবাদ সম্মেলনে সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার বিষয়ে শিল্পসচিব বলেন, ঘটনার পেছনের ইন্ধনদাতারা আগুন দিয়েছে বলে তাঁদের ধারণা। অবৈধ দখলদারদের দৌরাত্ম্যে ‘বিরক্ত’ লোকজনও এতে অংশ নিয়ে থাকতে পারে। অবশ্য ওই ভূমির দলিল ও পুরোনো কাগজপত্র পর্যালোচনা করে অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেন, জমি যে সাঁওতালদেরই তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কাগজে দেখা যায়, ১৯৬২ সালের ৭ জুলাই একটা চুক্তির মাধ্যমে চার মৌজার ১ হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। চুক্তিপত্রের ৫ ধারায় বলা আছে, চিনিকল এবং আখ চাষের জন্য এ জমি নেওয়া হলো। যদি কখনো এ জমিতে এ ছাড়া (আখ চাষ ছাড়া) অন্য কিছু হয়,
তাহলে এটা মূল মালিকদের ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু তার আগেই ২০০৪ সালে চিনিকল লে-অফ ঘোষণার পরে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীকে নামে-বেনামে এ জমি লিজ দেওয়া হয়েছে। অধিগ্রহণের সময় ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে অধ্যাপক বারকাত বলেন, অধিগ্রহণের সময় তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল এমন তথ্য তিনি এখনো কোনো কাগজে পাননি। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিষয় হলো অধিগ্রহণের শর্তই ছিল আখ চাষ না হলে জমি ফেরত দেওয়া হবে। একই তথ্য দিয়ে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ইক্ষু খামার জমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সহসভাপতি ফিলিমন বাস্কে বলেন, ১৯৪৮ সালের অধিগ্রহণ আইন অনুসারে যে চুক্তি হয় তাতে বলা হয়েছে, জমিতে আখ ছাড়া অন্য ফসলের চাষ হলে প্রকৃত মালিকদের জমি ফেরত দিতে হবে। কিন্তু ১ হাজার ৮৪২ একর জমির মধ্যে মাত্র ১০০ একর জমিতে আখ চাষ করা হচ্ছে। বাকি জমিতে ধান, তামাকসহ বিভিন্ন শস্য চাষ হচ্ছে। তাই তাঁরা এখন জমি ফেরত চান। এর আগে গত শনিবার গাইবান্ধায় সাঁওতাল-অধ্যুষিত দুটি গ্রামে হামলায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় সাংসদ ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করেন সাঁওতাল নেতারা। তাঁরা বলেন, চিনিকলের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ মেটাতে সাংসদ আবুল কালাম আজাদ ও ইউপি চেয়ারম্যান শাকিল আহমেদের সহযোগিতায় তাঁরা চার বছর আগে আন্দোলন শুরু করেন। কিন্তু সাংসদ ও চেয়ারম্যান মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সহিংস ঘটনায় ইন্ধন জুগিয়েছেন। সাংসদ ও চেয়ারম্যান অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। হাতকড়া খোলার নির্দেশ হাইকোর্টের: নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, চিকিৎসাধীন তিন সাঁওতালের হাতকড়া খুলে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার ও গাইবান্ধার পুলিশ সুপারের প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়ে ১৬ নভেম্বরের মধ্যে তিন কর্মকর্তাকে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে এ বিষয়ে রুল জারি করেন।
পুলিশ ও চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ চরণ সরেন, বিমল কিছকু ও দ্বিজেন টুডু এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁদের হাতকড়া পরা অবস্থায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এমন একটি ছবিসহ ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদন যুক্ত করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে গতকাল রিট আবেদনটি করেন আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। আদালতে রিটের পক্ষে তিনি নিজেই শুনানিতে অংশ নেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু। জ্যোতির্ময় বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, আহত তিনজনের মধ্যে দ্বিজেন টুডু ঢাকায় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে এবং চরণ সরেন, বিমল কিছকু রংপুর মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন। তাঁরা গুলিতে আহত হয়েছেন। শারীরিকভাবে নিজেরা চলতে অক্ষম। তাঁদের পালানোর কোনো সম্ভাবনাও নেই। এভাবে হাতকড়া পরানো মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এসব যুক্তিতে রিটটি করা হয়। রুলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনজনকে হাতকড়া পরানো কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। রংপুর থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিমল কিছকুর হাতে হাতকড়া ছিল। তাঁর বাঁ পায়ের তালু এবং ডান পায়ের হাঁটুর ওপরে ব্যান্ডেজ। তবে চরণ সরেনের হাতে হাতকড়া ছিল না। চরণের স্ত্রী পানি মুরমু বলেন, ‘সাংবাদিক ও অন্য লোকজন আসার আগে হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়। চলে গেলে আবার হাতকড়া লাগানো হয়।’ বিমল কিছকুর স্ত্রী ডিজিলিয়াও একই অভিযোগ করেন। এ প্রসঙ্গে গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুব্রত সরকার বলেন, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশের পর হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়েছে।
মানববন্ধন-সমাবেশ: গতকাল বিকেলে গোবিন্দগঞ্জ-দিনাজপুর সড়কের গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটা এলাকায় মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার দাবিতে সাপমারা ইউপির চেয়ারম্যান এ কর্মসূচির আয়োজন করেন। সমাবেশ প্রসঙ্গে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ইক্ষু খামার জমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সহসভাপতি ফিলিমন বাস্কে বলেন, যারা সাঁওতালদের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছে, তারাই মানুষের কাছে ভালো সাজার জন্য এই সমাবেশ করেছে।

Post a Comment

 
Back To Top