Last Update

Tuesday, April 18, 2017

এরদোগানের সাফল্যের রহস্য কোথায়

নির্বাচনে জয় নিয়ে যদি আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিযোগিতা থাকত, তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান বিশ্বের অবিসংবাদিত, অপরাজিত ও হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরিচিতি পেতেন। গত দেড় দশকে এরদোগান ১১টি নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে ৫টি পার্লামেন্ট নির্বাচন, ২টি গণভোট, ৩টি স্থানীয় নির্বাচন ও একটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। আর প্রত্যেকটিতেই তিনি সন্দেহাতীত জয় পেয়েছেন। রোববার অনুষ্ঠিত গণভোটে তিনি ১২তম জয় নিশ্চিত করেছেন। ২০০২ সালে তার দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (একে) পার্টি ক্ষমতায় আসার পর এ নির্বাচনকেই ‘সর্বোচ্চ ব্যালট-বক্স চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তুর্কিদের উদ্দেশে এরদোগান ঘোষণা দেন, ‘জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনছি। প্রশ্ন হচ্ছে, পশ্চিমাদের এত সমালোচনা সত্ত্বেও এরদোগানের তুমুল জনপ্রিয়তা ও নির্বাচনী ধারাবাহিক সাফল্যের রহস্য কী? বিশ্লেষকরা বলছেন, তুরস্ককে দারিদ্র্য থেকে বের করে অর্থনৈতিক উন্নতির চরম শিখরে আনা, দেশকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার যোগ্যতায় তুলে ধরা, ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে আন্তর্জাতিক সংকটে ভূমিকা রাখা ও তুর্কিদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই এরদোগানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ১৯৫৪ সালে তুরস্কের কাসিমপাসায় জন্মগ্রহণ করেন রিসেপ তায়েপ এরদোগান। শৈশব কেটেছে কৃষ্ণসাগরের পারে। ১৩ বছর বয়সে ইস্তাম্বুলে আসেন।
সেখানে রাস্তায় বিক্রি করতেন লেবু, তিল ও ঝুটি। পরবর্তী সময় পড়ালেখা করেছেন ব্যবসায় প্রশাসনে। জড়িয়ে পড়েন ইসলামী আন্দোলনে। ১৯৯৪ সালে ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচিত হন। দেড় কোটি মানুষের শহর ইস্তাম্বুলে তখন তিনি যানজট ও বায়ুদূষণ রোধ করে নগরের চেহারা পাল্টে দেন। তুরস্কে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে তিনি বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে একটি ধর্মীয় কবিতা আবৃত্তির কারণে চার বছরের জেল হয় তার। কবিতাটি ছিল, ‘মসজিদ আমাদের ক্যান্টনমেন্ট, গম্বুজ আমাদের হেলমেট, মিনার আমাদের বেয়নেট এবং বিশ্বাসীরা আমাদের সৈনিক।’ এরদোগানের দীর্ঘদিনের মিত্র আবদুল্লাহ গুল ও অন্যদের সঙ্গে মিলে ২০০১ সালে একে পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০২ সাল থেকে এ দলটি প্রতিটি নির্বাচনে জয়লাভ করে আসছে। অতীতে জেল খাটায় প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি তিনি। পার্লামেন্টে নতুন আইন পাসের মাধ্যমে ২০০৩ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে তুরস্কের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন। এই এক যুগের শাসনে তুর্কি জনগণকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, নাগরিক অধিকার, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিয়েছেন ৬৩ বছর বয়সী এরদোগান। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০০৩ সালে এরদোগান যখন প্রধানমন্ত্রী হন তখন ব্যক্তির গড় আয় ছিল ৩ হাজার ৮০০ ডলার। ২০০৭ সালে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ডলারে। এর মানে হল, ওই সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ২৩ শতাংশ থেকে ২ শতাংশেরও নিচে নেমে আসে। কার্নেগি ইউরোপের একজন ভিজিটিং স্কলার মার্ক পিরিনি বলেন, ‘তুরস্কে এখন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জীবনধারা অনেকটাই বদলে গেছে। আপনি যদি দুই বাচ্চাসহ ৩০ বছর বয়সী একটি দম্পতিকে আজ থেকে ১০ বছর আগের অন্য একটি দম্পতির সঙ্গে তুলনা করেন, তাহলে পার্থক্যটা পরিষ্কার বোঝা যাবে।
আজ তারা একটি ভিন্নধারা জীবনযাপন করছেন।’ মার্ক পিরিনি ২০০৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তুরস্কে ইইউর রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পিরিনি জানান, এরদোগান যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন তার সরকার পূর্বসূরিদের কাছ থেকে একগুচ্ছ সংস্কার পদ্ধতি গ্রহণ করেন এবং দেশটির অবকাঠামো এবং সেবার মান বৃদ্ধির জন্য একসঙ্গে কাজ করেন। এছাড়াও সরকার মধ্যম শ্রেণীর জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করে। তিনি বলেন, ‘আজকের একজন মধ্যবিত্ত দম্পতিরও অন্তত একটি অ্যাপার্টমেন্ট আছে। ক্রেডিটের সঙ্গে অবশ্যই তাদের একটি গাড়ি আছে। তারা কেনাকাটা করতে শপিং সেন্টারে যান এবং তারা ভ্রমণেও বের হন। তারা নিজস্ব এয়ারলাইন ব্যবহার করতে পারেন, যা ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল না। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এরদোগান জনপ্রিয়তায় এতটা তুঙ্গে আর গণবক্তৃতায় এতটাই দক্ষ যে, শ্রোতাদের হাতের তালুতে করে নাচাতে পারেন।’ নিজের মোবাইল ফোনের ফেসটাইম লাইভে জনগণকে ডাক দিয়েছেন, আর সঙ্গে সঙ্গেই প্রশিক্ষিত সশস্ত্র সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থান ঠেকিয়ে দিয়েছে নিরস্ত্র জনতা। লম্বা স্লিম মধ্যবয়স্ক এরদোগান রাজনীতিতে এক ভিন্নধর্মী ইমেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। ২০১২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন কোনো মুসলিম দেশে প্রেসিডেনশিয়াল সফরে গেলেন, তুরস্ককে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতম পাঁচ মিত্র দেশের অন্যতম বলে উল্লেখ করলেন। এরদোগানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ঘোষণা দিলেন, ‘একজন নেতা কীভাবে একই সঙ্গে ইসলামিক,
গণতান্ত্রিক ও সহিষ্ণু হতে পারে, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এরদোগান।’ রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইসলাম, অর্থনীতি ও গণতন্ত্রকে সমন্বিত করে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি রোল মডেল সৃষ্টি করেছেন। কামাল আতাতুর্ক তুরস্কের জনগণের ধর্ম পালনের অধিকার কেড়ে নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলামী ঐতিহ্য ও চেতনা মুছে ফেলেছিলেন। এরদোগান সেই ক্ষত সারিয়ে বলেছেন, ধর্ম পালনে কাউকে বাধ্য যেমন করবেন না, তেমনি ধর্ম পালনে কেউ যেন বাধা না দিতে পারে, সে ব্যবস্থা তিনি করবেন। এরদোগানের সমর্থকরা বলছেন, রোববারের ঐতিহাসিক গণভোটের মাধ্যমে স্থিতিশীল ও শক্তিশালী সরকার পাবে তুরস্ক। এখন থেকে আর জগাখিচুরি জোট সরকারের রাজনীতি করতে হবে না। ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিশ্বদরবারে দাপটীয় প্রতিনিধিত্বের সুযোগ ঘটবে। অন্যদিকে বিরোধীরা বলছেন, এর মাধ্যমে ন্যাটো সদস্য তুরস্কে ‘এক ব্যক্তির শাসন’ প্রতিষ্ঠা পাবে। সংসদীয় আইনের পরিবর্তে ‘ডিক্রি’ বিধান চালু হবে। সমালোচকদের মতে, তুমুল জনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে তুর্কিদের ওপর প্রতাপশালী নয়া সুলতান হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন এরদোগান। এবার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে মার্কিন স্টাইলের সর্বক্ষমতাসম্পন্ন প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন তিনি। এভাবে গণতান্ত্রিক উপায়েই ‘এক ব্যক্তির শাসন’ প্রতিষ্ঠায় উচ্চাভিলাষী এরদোগান।

Post a Comment

 
Back To Top